
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়ায় সেনা আবাসন প্রকল্পের (আর্মি হাউজিং স্কিম) জমি কেনা নিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে র্যাব-পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে সেনাসদস্য, পুলিশসহ অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। এ সময় সেনাক্যাম্প থেকে গুলি করা হয় বলে গ্রামবাসী অভিযোগ করেছে। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী স্থানীয় তিনটি সেনাক্যাম্পে হামলা ও লুটপাট চালায়। তারা একটি ক্যাম্প ও গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সময় গ্রামবাসী ক্যাম্পের সেনাসদস্যদের প্রায় ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে দুটি হেলিকপ্টার পাঠিয়ে তাঁদের সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনার পর সেখান থেকে সব ক্যাম্প গুটিয়ে নেওয়া হয় বলে সেনা সূত্র জানায়।
আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে রাতে এ ঘটনা সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, কয়েক মাস ধরে স্থানীয় একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই প্রকল্পের কাজে বাধার সৃষ্টি করছিল। মহলটি স্থানীয় জমির মালিক ও এলাকাবাসীকে বিভিন্ন ধরনের প্ররোচনা দিয়ে উসকে দেয় এবং সেনাবাহিনী সম্পর্কে বিরূপ ও ভীতিকর ধারণা সৃষ্টি করে। গুলি প্রসঙ্গে সেনাবাহিনীর পক্ষে বলা হয়েছে, উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠী সেনাবাহিনীর অস্থায়ী অফিসে (ক্যাম্প) আক্রমণ করে। এ সময় সেনাসদস্যদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে দুর্ঘটনাবশত কয়েকটি গুলি বেরিয়ে যায়।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত করা হবে। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত পাঁচ-ছয় মাসে কায়েতপাড়া ও রূপগঞ্জ ইউনিয়নের ২৪টি মৌজায় এই প্রকল্পের নামে জমি কেনা শুরু হয়। জমি কেনার জন্য উপজেলার তানমুশরি, পূর্বগ্রাম, ইছাপুরা ও রূপগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে ক্যাম্প স্থাপন করে সেনাবাহিনী। ইউনিফর্ম পরে সেনাসদস্যরা ওই ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। তাঁরা ওই এলাকার জমি অন্য কারও কাছে বিক্রি না করার জন্য নির্দেশ দেন বলে গ্রামবাসী জানান। গ্রামের একজন বাসিন্দা জানান, এই নির্দেশের কারণে ভাইয়ের জমি ভাই, বোনের জমি ভাই, বাবার জমি ছেলে কিনতে পারছিলেন না। এর প্রতিবাদে এলাকাবাসী গতকাল শনিবার সকালে রূপগঞ্জ কাজী আবদুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে।
ইছাপুরা গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, এখানে জমির বর্তমান বাজারমূল্য ৩০ থেকে ৭০ লাখ টাকা বিঘা। অথচ এই জমি ১৪-১৫ লাখ টাকা বিঘা দরে বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছিল। কারা বাধ্য করছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর নাম ভাঙিয়ে কিছু দালাল তাঁদের জমি কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করত। কায়েতপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জায়েদ আলী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের আরেক নেতা তারেক এই চক্রের হোতা।
গ্রামবাসী জানান, এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে সেখানে উত্তেজনা চলছিল। গতকাল ভোর থেকে ক্ষুব্ধ জনতা রূপগঞ্জ-ইছাপুরা-কালীগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে। সড়কের আট কিলোমিটার এলাকার রাস্তায় কাঠ ও গাছের গুঁড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। তারা সড়ক কেটে দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়।
হারু মিয়া নামে এক গ্রামবাসী জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার জন্য এলাকার চার ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানান একজন সেনা কর্মকর্তা। তাঁরা ক্যাম্পে যাওয়ার পর গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তাঁদের একজন সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। মুহূর্তেই এলাকাবাসী লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। একপর্যায়ে তারা সেনাবাহিনীর তানমুশরি ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে একটি গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। একে একে চারটি ক্যাম্পই লোকজন ঘেরাও করে। এ সময় সেনাক্যাম্প থেকে গুলি করা হয় বলে গ্রামবাসী অভিযোগ করেন।
গ্রামবাসী জানান, সেনাসদস্যদের উদ্ধারের জন্য র্যাব-পুলিশ এলাকায় অবস্থান নিয়ে লোকজনকে সরিয়ে দিতে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় ভেতরে আটকা পড়েন সেনাসদস্যরা। দফায় দফায় সংঘর্ষে পুরো এলাকা যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। গ্রামবাসী পুলিশ ও র্যাবকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। পুলিশ-র্যাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গুলিবর্ষণ, কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে। এভাবে সকাল থেকেই সাত-আট হাজার লোক পুলিশ-র্যাবের সঙ্গে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। তারা সড়কে বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করে।
এলাকাবাসী কয়েকজন নিহত হওয়ার দাবি করলেও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য মেলেনি। তবে গুলিবিদ্ধ হন ১৫ জন। আহত হন রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফোরকান শিকদার, এসআই মঞ্জুর হোসনে, আলী হোসেন, কনস্টেবল নাজিমসহ অনেকে। তাঁদের ট্রলারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা জাহেদ আলীকে মারধর করে এবং তাঁর বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালায়। তাঁর সহযোগী হেলালের মোটরসাইকেলও জ্বালিয়ে দেয় জনতা।
দুপুরের দিকে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত হতে থাকে। সাবেক সেনাপ্রধান ও রূপগঞ্জের সাবেক সাংসদ কে এম সফিউল্লাহ, নারায়ণগঞ্জের সাবেক সাংসদ শামীম ওসমান ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।
বেলা সাড়ে তিনটার দিকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ক্যাম্পের সেনাসদস্য ও সেনা কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। ক্যাম্পও গুটিয়ে ফেলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেনাসদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পর লোকজন একটি ক্যাম্পে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারা আসবাব ও ব্যবহারের জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। গ্রামবাসী ক্যাম্পের টিন পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়।
রূপগঞ্জ থানার ওসি ফোরকান শিকদার বলেন, সকাল থেকেই সাত-আট হাজার গ্রামবাসী বিক্ষোভ শুরু করে। তারা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে ও সড়ক অবরুদ্ধ রাখে।
জেলা পুলিশ সুপার বিশ্বাস আফজাল হোসেন জানান, আর্মি হাউজিং স্ক্রিমের নামে সেনাবাহিনী জমি কিনছিল। এ নিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে বিরোধের জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ কোনো গুলিবর্ষণ করেনি।
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সাংসদ গাজী গোলাম দস্তগীর জানান, কয়েকটি চিহ্নিত আবাসন প্রকল্পের লোকজন এলাকাবাসীকে উসকে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এটি সেনাবাহিনী, আওয়ামী লীগ ও জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর গভীর ষড়যন্ত্র। তিনি বলেন, এ কাজে বিপুল অর্থ খরচ করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, এটি পূর্বপরিকল্পিত।
১৫ জন হাসপাতালে: এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ১৫ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এঁদের প্রায় সবার শরীরে এক বা একাধিক গুলি লেগেছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। গতকালই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীর থেকে গুলি বের করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৪ জনের বাড়ি রূপগঞ্জে। একজনের বাড়ি ময়মনসিংহে। এঁরা হলেন রূপগঞ্জের বাশার (২৯), সাত্তার (৭০), নূর আলম (৩৫), নোমান (১৮), আবুল হোসেন (২৫), জামাল (২৬), মকবুল দেওয়ান (৩২), মো. শওকত (৪০), ইউনূস (৬০), আইয়ুব (২৮), আনোয়ার (২০), মোমেন (১৮), মনির হোসেন (৩০), তাবি (২৯) ও ময়মনসিংহের মো. মাসুম (১৫)।
ক্যাজুয়ালিটি ওয়ার্ডে আনা মাসুম প্রথম আলোকে জানান, ‘সবাই মিছিল করতে ছিল। সে সময় আমি দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। একটু পরে গুলি শুরু হলে আমি দৌড় দেই। কিন্তু আমার পেছনে গুলি লাগে।’
গুলিবিদ্ধ মনির হোসেন কথা বলতে পারছিলেন না। তবে তাঁর সঙ্গে আসা এক আত্মীয় জানান, গরিবের জমি কম দামে নিয়ে যাচ্ছে। বিক্রি না করলে অত্যাচার করা হয়। এ জন্য সবাই প্রতিবাদ করতে গেলে তিনিও জমি বাঁচাতে সেখানে যান।
আর্মি হাউজিং স্কিম: সেনা সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত বছরের অক্টোবরে সেনাবাহিনীর আবাসন সমস্যা মেটাতে আর্মি হাউজিং স্কিম বা এএইচএস হাতে নেওয়া হয়। গত জানুয়ারি মাসে প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন করেন। এই প্রকল্পের জন্য একটি পৃথক কার্যালয়ও স্থাপন করা হয়। কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লে. জেনারেল ইকবাল করীম ভূঁইয়া এর প্রধান।
সেনা কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটির আয়তন ধরা হয় ১৩ হাজার বিঘা। ২০১৫ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। মোট জমির মধ্যে সেনাবাহিনী এ পর্যন্ত এক হাজার ৪০০ বিঘা জমি কিনে নিয়েছে। বাকি জমি কেনার প্রক্রিয়া চলছে।
সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের জন্য গত এপ্রিল ও জুলাই মাসে সেনা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে দুই কিস্তিতে চার লাখ করে আট লাখ টাকা জমা নেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে চার হাজার ৮০০ জন, পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে তিন হাজার সেনা কর্মকর্তা তাঁদের প্লটের জন্য আবেদন করেন এবং কিস্তির টাকা পরিশোধ করেন।
প্রকল্পের অবস্থান: প্রকল্পটির এলাকা হলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার নাওরা, বরুনা, হরিণা, তানমুশরি, তাগাবেল নাওরা, বাড়িছানি, পূর্বগ্রাম, নগড়পাড়া, কায়েতপাড়াসহ আশপাশের কিছু গ্রাম। এর পশ্চিম দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, উত্তরে পূর্বাচল। এটি বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর ঠিক মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত।