Sunday, 24 October 2010

বন্ধ বাজারগুলো বন্ধ হয়েই আছে, নতুন বাজারও নেই জনশক্তি রপ্তানি কমছেই, ধাক্কা প্রবাসী-আয়েও

বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা কেটে গেলেও বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি না বেড়ে উল্টো কমছে। ২০০৯ সালের তুলনায় এ বছরের গত নয় মাসে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। এর চেয়েও বড় দুঃসংবাদ হচ্ছে, প্রবাসী-আয়ও (রেমিট্যান্স) কমতে শুরু করেছে।
২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসী-আয় কমেছে প্রায় ২ শতাংশ, অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসী-আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ শতাংশ।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে দুই লাখ ৯১ হাজার ৯০৪ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। অথচ গত বছরের একই সময়ে গিয়েছিলেন তিন লাখ ৫৮ হাজার ১৭১ জন। অর্থাৎ নয় মাসে আগের তুলনায় ৬৬ হাজার ২৬৭জন কর্মী কম বিদেশে গেলেন।
২০০৭ সালে আট লাখ ৩২ হাজার ৬০৯ জন এবং ২০০৮ সালে আট লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা কমে হয় চার লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮। আগের দুই বছরের তুলনায় ২০০৯ সালে জনশক্তি রপ্তানি অর্ধেকে নেমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে সরকারের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বিশ্বমন্দার কারণেই এ সমস্যা। ২০১০ সালে মন্দা কেটে গেলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু বিশ্বমন্দা কেটে গেলেও বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি বাড়েনি, বরং কমছেই।
জনশক্তি রপ্তানি দিন দিন কমে যাওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে না। তবে জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজারগুলো বন্ধ। নির্দিষ্ট এই বাজারগুলোর দিকে ঝুঁকে থাকার কারণেই এ সমস্যা হচ্ছে। নতুন নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে না পারলে সামনে এই সংখ্যা আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বায়রার মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, হঠাৎ করে এক দিনে জনশক্তি রপ্তানি কমেনি। অনেক দিন ধরেই কমছে। এর মূল কারণ প্রচলিত বাজারগুলো চালু হচ্ছে না। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কুয়েত ও কাতার হচ্ছে বাংলাদেশের মূল বাজার। এই বাজারগুলোর ওপরই নির্ভর করছে জনশক্তি রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ। এসব বাজার চালু হলেই জনশক্তি রপ্তানি বাড়বে। বাজারগুলো চালু করার জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে যৌথ প্রচেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, বন্ধ বাজারগুলো চালু করার জন্য সরকারি সব প্রচেষ্টাই অব্যাহত আছে। একই সঙ্গে নতুন নতুন বাজার খোঁজার চেষ্টাও চলছে। বিভিন্ন দূতাবাসে চিঠি দিয়ে বাজারের সার্বিক খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ বছর চার লাখ লোক বিদেশে যাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বছরের বাকি মাসগুলোতে জনশক্তি রপ্তানি বাড়বে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গত কয়েক বছরে বিদেশে লোক যাওয়া কমেছে। অনেক লোক ফেরতও আসছেন। এগুলো রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে। তবে কারণ যা-ই হোক, সেটা অনুসন্ধান করা জরুরি। তিনি বলেন, কূটনৈতিক কোনো দুর্বলতার কারণে বিদেশে লোক যাওয়া কমলে সেটি খুঁজে বের করতে হবে।
জনশক্তি রপ্তানি কমার পরিমাণ: গত বছরের জানুয়ারিতে ৫০ হাজার ৬৩২ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এ বছরের জানুয়ারিতে তা কমে হয়েছে ৩৩ হাজার ৮৪৭ জন। অর্থাৎ রপ্তানি কমেছে ৩৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গিয়েছিলেন ৪৩ হাজার ৮৫৬ জন, আর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে গেছেন ২৭ হাজার ৪৯ জন। গত বছরের মার্চে গিয়েছিলেন ৪২ হাজার ৯৪৫ জন, এই মার্চে গেছেন ৩৮ হাজার ২৪৪ জন। গত এপ্রিলে গিয়েছিলেন ৩৯ হাজার ৪৯ জন, এ এপ্রিলে ৩৫ হাজার ৬৪৭ জন। গত জুনে যাওয়ার পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন, এ জুনে ৩৪ হাজার ৭৯৮ জন। গত জুলাইয়ে যান ৩৮ হাজার ২৫ জন, আর এই জুলাইয়ে গেছেন ২৮ হাজার ৩৪৭ জন। গত আগস্টে গিয়েছিলেন ৩৮ হাজার ৪৩৪ জন, এবার ৩১ হাজার ৭৮৫ জন। সবশেষে গত বছরের সেপ্টেম্বরে গিয়েছিলেন ৩০ হাজার ৮১২ জন, সে তুলনায় এবার গেলেন ২৮ হাজার ৯৪৮ জন।
কমছে প্রবাসী-আয়: চলতি বছরের জুন মাস থেকে রেমিট্যান্স কমতে শুরু করে। গত বছরের জুনে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯১ কোটি ৯১ লাখ ডলার বা ছয় হাজার ৩৪৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। কিন্তু এ বছরের জুনে রেমিট্যান্স এসেছে ৮৯ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বা ছয় হাজার ১৮৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আড়াই শতাংশ বা ১৫৮ কোটি টাকা রেমিট্যান্স কম এসেছে।
২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই ও তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরেও আগের বছরের তুলনায় রেমিট্যান্স কম এসেছে। গত বছরের জুলাইয়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮৮ কোটি ৫৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার বা ছয় হাজার ১১৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এবার এসেছে ৮৫ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলার বা পাঁচ হাজার ৯৫৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮৮ কোটি ৭৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার বা ছয় হাজার ১২৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। কিন্তু এই সেপ্টেম্বরে এসেছে ৮৩ কোটি ৮১ লাখ ৭০ হাজার ডলার বা পাঁচ হাজার ৮২৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৩০৫ কোটি টাকা বা প্রায় ৫ শতাংশ কম রেমিট্যান্স এসেছে। একমাত্র ব্যতিক্রম আগস্টে রেমিট্যান্স-আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। ঈদের কারণেই এই মাসে আয় বেড়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর দিকে বেশি নজর দিতে হবে। দক্ষ কর্মী গেলেই রেমিট্যান্স বেশি আসবে।
বড় চার বাজার পরিস্থিতি: কয়েক বছর ধরে প্রায় বন্ধ থাকা সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও কুয়েতের বাজার এখনো বন্ধই আছে। একই সময় নতুন কোনো বাজারও চালু হয়নি। ফলে শ্রমবাজারও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। গত দেড় বছরে দেশের জন্য বিকল্প বাজার হয়ে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লিবিয়া। কিন্তু পাঁচ মাস ধরে লিবিয়ার বাজারও হঠাৎ করে বন্ধ। এ বছরের শুরুতে যেখানে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার লোক লিবিয়া গেছেন, সেখানে জুনে মাত্র ৩৮৯ জন কর্মী গেছেন। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত একজনও সেখানে যাননি।
আগে বছরে ৩০ থেকে ৪০ হাজার লোক সৌদি আরব ও মালয়েশিয়া যেতেন। অথচ গত নয় মাসে গেছেন যথাক্রমে পাঁচ হাজার ৭৪৮ জন এবং ৬০৯ জন। এ বছর কুয়েতে গেছেন মাত্র ৩৪ জন। ২০০৯ সালে দুই লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৮ জন কর্মী সংযুক্ত আরব আমিরাত গিয়েছিলেন। কিন্তু এ বছরের গত নয় মাসে সেখানে গেছেন এক লাখ ৫৩ হাজার ৬০০ জন।
নতুন বাজার নেই: বড় শ্রমবাজারগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেলেও নতুন বাজার পাওয়া যায়নি। সরকারের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, নতুন নতুন বাজার খোঁজা হচ্ছে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা সেভাবে আসছে না বলে দাবি জনশক্তি রপ্তানিকারকদের।
জনশক্তি রপ্তানিবিষয়ক টাস্কফোর্সের প্রধান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আসাদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জনশক্তি রপ্তানি বাড়াতে প্রচলিত শ্রমবাজারের বাইরে নতুন ১৬টি দেশের তালিকা করা হয়েছে। দেশগুলোর পরিস্থিতি দেখতে পাঁচটি দলও গঠন করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে প্রতিনিধিদল গিয়ে সার্বিক অবস্থা জানার চেষ্টা করবে। তারা শ্রমবাজার অনুসন্ধান, সমস্যা নিরূপণ ও সমস্যা সমাধানের কৌশল নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদনও দেবে।

Blog Archive